৩১°সে
কক্সবাজার

ছেড়াদ্বীপ

February 13, 2016

chera-dip-saintmartinচারিদিকে নীল জলের উন্মাতাল সমুদ্র। আর তার বুকের মাঝে নির্জন এক দ্বীপ। দ্বীপের প্রবাল আর পাথরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে শুভ্র ফেনা তুলে গর্জে উঠছে, দ্বীপে কেয়া আর নিশিন্দার ঝোপ, বালুর মাঝখানে শ্যাওলা সবুজ এক ডোবা, ডোবার পাড়ে ঠেসমূলগুলো দাড়িয়ে আছে অনবদ্য ষ্ট্যাচুর মতো, বালুর উপর ছোটাছুটি করছে লাল কাঁকড়া, গিরগিটি, পড়ে আছে রঙিন শামুক, মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলেছে গাঙচিল কোন্ অজানায়। এই অপরূপ জনমানবহীন দ্বীপটি খুব বেশি দূরে নয়, টেকনাফ উপজেলা থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে।

ঈদের ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনায় ছেড়াদিয়া বা ছেড়াদ্বীপকে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখার মতো। ছেড়াদ্বীপ মানে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আসলে নারিকেল জিনজিরা বা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আশপাশে এ রকম দ্বীপের সংখ্যা একটি নয়, বরং বেশ কয়েকটি। যদিও পর্যটকদের কাছে মূলত নিকটতমটিই ছেড়াদ্বীপ নামে পরিচিত। আর স্থানীয় বাসিন্দারা যেহেতু দ্বীপকে দিয়া বলে ডাকে, তাই এর স্থানীয় নাম সিরাদিয়া বা ছেড়াদিয়া। সেন্ট মার্টিনের মতোই ছেড়াদ্বীপ চুনাপাথর, ঝিনুক, শামুকের খোলস এবং প্রবাল দিয়ে তৈরি। সমুদ্রপথে ছেড়াদ্বীপে যাওয়ার মোক্ষম সময় হচ্ছে ভাটার সময়।

কেননা ভাটায় ছোট ছোট খাঁড়ি ও চারপাশের অগভীর সমুদ্রে ভেসে ওঠে জীবিত ছোট ছোট প্রবাল গোষ্ঠী, যা জোয়ারের সময় আবার পানিতে তলিয়ে যায়। এগুলোর কোনোটা ভাটার সময় পানি স্তরের চেয়ে প্রায় তিন-চার গজ উপরেও দেখা যায়। দ্বীপে প্রায় ২০০-র মতো প্রজাতির জীবের উপস্থিতি রয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। নারিকেল জিনজিরায় পাচ শতাধিক মৎস্যজীবী পরিবারের বসবাস হলেও ছেড়াদিয়া পুরোপুরি জনবসতিহীন।

কারণ, সুপেয় পানির অভাব। সেন্ট মার্টিনের সমুদ্র একটু অন্য রকম, মুহূর্তে মুহূর্তে তার রূপ পাল্টায়। সকালে সেন্ট মার্টিনের অপরিসর পাথুরে সৈকতে পা ফেলে ফেলে হেটে আসার স্মৃতি রাতে অবিশ্বাস্য কল্পনা মনে হবে। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখবেন সেই পাথুরে সৈকত আর কোথাও নেই, সমুদ্রের পানি সব কিছু তছনছ করে দিয়ে ভয়ংকর রাগে গর্জে উঠতে উঠতে ততক্ষণে জনবসতির কাছে চলে এসেছে।

রাতের অন্ধকারে ঢেউয়ের মাথায় ভেসে থাকা শুভ্র-সাদা ফেনা ধুন্দুমারের মতো এগিয়ে আসতে আসতে এমনকি অনেক ভেতরে দাড়িয়ে থাকা আপনার পা দুটো ভিজিয়ে দেবে সরোষে। নারিকেল জিনজিরায় সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে নিয়ে সকালে উঠেই তৈরি হয়ে নিন। ছেড়া দ্বীপে যাবার ঘাটটি কাছেই আর ঘাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য গদি-আটা ভ্যানগাড়িগুলো সব সময়ই প্রস্তুত থাকে। ছেড়াদ্বীপে যেতে হবে স্পিডবোট এ বা ট্রলারে।

দুটোই সমান রোমাঞ্চকর। ভাটার সময়টা আগেই জেনে নিবেন,কেননা ছেড়াদ্বীপে যেতে হবে ভাটার সময়ই, নইলে ভেসে ওঠা প্রবালগুলো দেখা যাবে না। দরদাম করে নিয়ে স্পিডবোটে উঠবেন, সমুদ্রের বুকের উপর দিয়ে ছুটিয়ে নেবে মাত্র ১০/১৫ মিনিটেই। স্পিডবোট বা ট্রলার যাতেই চড়ে যান না কেন,পাথুরে ছেড়াদ্বীপের একেবারে কিনারা পর্যন্ত যাবে না ওটা। কেননা পাথরে আঘাত লেগে ক্ষতি হতে পারে ওটার। তাই আপনাকে নেমে যেতে হবে খানিকটা দূরেই।

ভাটা সম্পূর্ণ হলে বাকি পথটুকু হাটু অবধি ডুবিয়ে হেটেই চলে যেতে পারবেন, নাহলে স্পিডবোট থেকে লাফিয়ে ছোট নৌকায় উঠতে হবে। নৌকা নিয়ে যাবে দ্বীপে । সেটাই বেশি ভালো হবে, কারণ ডুবন্ত পাথর আর প্রবালে হাটা বেশ বিপজ্জনক, পা পিছলে যেতে পারে বা কেটে যেতে পারে। ছেড়াদ্বীপে নেমে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অনুভূতি হবে আপনার।

নির্জনতা আর নৈঃশব্দে মাখামাখি এর অভাবনীয় সৌন্দর্য্য। প্রকৃতি দুহাতে ঢেলে দিয়েছে একে তার সৌন্দর্য্য। সুপেয় পানির অভাব এখানে জনবসতি গড়ে উঠতে দেয়নি। কেয়া, নিশিন্দা, সাগরলতা, ছোট ছোট খাড়িতে আটকে পড়া রঙিন মাছ, শামুক,ঝিনুক, কাকড়া আর জীবিত ও মৃত প্রবালই এই দ্বীপের একমাত্র বাসিন্দা। এই নির্জন প্রকৃতি সচরাচর মেলে না। গোটা দ্বীপ ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে আধঘণ্টাও লাগবে না। সমুদ্রের কিনারা ঘেষে হাটতে হাটতে দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশে একবার ঢুঁ-মারতে ভুলবেন না ।

এখানে কেয়াঝোপের আড়ালে রয়েছে শ্যাওলা সবুজ এক জলাশয়, লতাগুল্ম আর বুনোঝোপের মধ্যে যাকে ডিসকভারি চ্যানেলে দেখা কোনো গা ছমছম করা জংলা চোরাবালির মতো লাগে দেখতে। জোয়ার-ভাটার খেলায় আপনার চোখের সামনে ভাসতে আর ডুবতে দেখবেন পাথর আর প্রবালকে । পূর্ণ জোয়ার চলে আসার আগেই নৌকায় করে গিয়ে আবার স্পিডবোটে উঠে পড়বেন ।

কেননা উত্তাল সাগরে নৌকা বা স্পিডবোটে চড়ার অনভিজ্ঞতা আপনাকে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দেবে, যখন বিশাল বিশাল ঢেউ ছুটে এসে স্পিডবোট কে কখনো ঢেউয়ের উপরে আবার কখনো ঢেউয়ের নীচে ফেলে দিয়ে লোফালুফি খেলতে থাকবে।সেন্ট মার্টিন ও ছেড়াদ্বীপে যাওয়ার মৌসুম হচ্ছে এখন থেকে ফেব্রুয়ারি। ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ পর্যন্ত বাস সার্ভিস আছে।

কীভাবে যাবেন সেন্টমার্টিন?
নিজস্ব গাড়ীতে বা ভাড়ার মাইক্রোবাসেও যাওয়া যায়। টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার জাহাজ কেয়ারী সিন্দাবাদ আর কুতুবদিয়া প্রতিদিন ছাড়ে সকাল ১০টায়,আবার সেন্ট মার্টিন থেকে বিকেল চারটায় ফিরতি পথে রওনা দিয়ে টেকনাফে ফিরে আসে। ভ্রমনে গেলে আপনার উচিত হবে তাড়াহুড়ো না করে সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন করা এবং পরদিন বিকেলের জাহাজে ফেরা। সেন্ট মার্টিনে যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই
সঙ্গে মশার স্প্রে ও বাড়তি কাপড়চোপড় সাথে নিয়ে যেতে হবে।

কোথায় থাকবেন
এখানে থাকার বেশ ভালো কিছু হোটেল রয়েছে অবকাশ,সীমানা পেরিয়ে,প্রিন্স হেভেন,স্যান্ড সোর,ব্লু মেরিন ইত্যাদি। একা আসলে সমস্যা নেই তবে সপরিবারে আসলে আগেই রিজার্ভেশন দিয়ে আসবেন।



Leave a Reply


error: Content is protected !!