৩১°সে
কক্সবাজার

দরিয়া নগর

February 13, 2016

doria-nogorসে অনেককাল আগের কথা। আরব দেশ থেকে তখন বণিক সওদাগররা জাহাজে করে বাণিজ্যে আসতেন পূর্বে। তখন বাংলাদেশ নামে কোন রাষ্ট্র ছিল না। ভারত হিসেবেও না। পূর্ব-পশ্চিম হিসেবে জানা হতো পুরো বিশ্বকে। আরব পশ্চিমের দেশ। সে হিসেবে সেখানকার ব্যবসায়ীরা তাদের রণতরী, বাণিজ্য তরী নিয়ে আসতেন পূর্বের বিভিন্ন দেশে। এসেছেন ইবনে বতুতাসহ অনেক পর্যটকও। সে রকমই একটি বাণিজ্য তরী নিয়ে বঙ্গোপসাগরে আসেন আরবের এক শাহেনশাহ। কিন্তু মাঝ নদীতে হঠাৎই ডুবতে বসে তার তরী। একে একে ডুবে যায় শাহেনশাহর তরীর সব মাঝি মাল্লা, সব পণ্য। অনেক কষ্টে সাঁতরে কূলে উঠতে সক্ষম হন শাহেনশাহ। কিন্তু নোনা জলে আর কতক্ষণ বাঁচা যায়। শুরু হলো মিষ্টি পানির সন্ধান। সাথে বেঁচে থাকার লড়াই। খুঁজতে খুঁজতে পেলেন এক গুহার সন্ধান। মিষ্টি পানি পেয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন শাহেনশাহ। কিন্তু সুখ যেন কপালে সইলো না। যেই মিষ্টি পানি পান করতে যাবেন অমনি হামলে পড়লো বন্য প্রাণির দল। তারপর এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে লুকিয়ে দিন কাটে শাহেনশাহের। অবশেষে আশ্রয় নেন এক গুহায়। সেখানে এক ঠাণ্ডা হিমেল রাতে নেমে আসে হিম পরির। পূর্ণিমা রাতে শাহেনশাহর সঙ্গে দেখা হয় হিমপরির। শুরু হয় দুজনের প্রেম ভালোবাসা। পরি তাঁকে নিয়ে পূর্ণিমা রাতে চলে যান পরির দেশে। শাহেনশাহ যে গুহায় আশ্রয় নেন পরে সেই গুহারই নাম হয় শাহেনশাহ গুহা। আর হিম পরির নামে হয় হিমছড়ি নাম। কক্সবাজারের হিমছড়ি, শাহেনশাহ গুহা এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। হিমছড়ি কিংবদন্তির ‘পরিমুড়া’, পাহাড় নামেও পরিচিত। শাহেনশাহ গুহা অবস্থিত দরিয়া নগরে। কক্সবাজারে খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠা পর্যটন কেন্দ্রের নাম দরিয়া নগর।

কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে গেলে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্ব দিকে দরিয়ানগর পর্যটন কেন্দ্র। পশ্চিমে বিশাল বঙ্গোপসাগর, পুবে উঁচু পাহাড়। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। এই পথ ধরে এগিয়ে গেলে নজরে পড়বে সবুজ-শ্যামলে ভরা একটি গ্রাম, নাম তার বড়ছেড়া। এই বড়ছেড়ার উঁচু-নিচু ৩৭ একরের বিশাল পাহাড় নিয়ে গড়ে উঠেছে পর্যটনের বিনোদন কেন্দ্র দরিয়ানগর। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো এ জায়গাটি বেড়ানোর জন্য ভালো জায়গা। জায়গাটির শুরুতেই রয়েছে বিশাল আকারের হা করা হাঙ্গর। এই হাঙ্গরের পেট দিয়েই প্রবেশ করতে হয় জায়গাটিতে। এরপরে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরের দিকে যেতে যেতে রয়েছে কাঠের ট্রেইল, পাহাড়ি ঝরনা, সুড়ঙ্গ পথ ইত্যাদি। কিছু দূর উপরে ওঠার পথে একটি পথ চলে গেছে নিচে আরেকটি উপরের দিকে। নিচেরটি ধরে এগোলে হাতের ডানে দেখা মিলবে ছোট্ট একটি ঝরনার। আর হাতের বাঁ দিকেরটি ধরে নিচে নেমে গেলে পাহাড়ের সুড়ঙ্গ পথ। এ পথের মাথায়ও আছে আরেকটি ঝরনা। এসব ঝরনায় এখন অবশ্য পানির স্রোত নেই। পাহাড় বেয়ে একেবারে উপরে উঠে গেলে সামনে নীল সমুদ্র, পেছনে উঁচু নিচু পাহাড়। দরিয়ানগরে আছে বিভিন্ন রকম কটেজ। এগুলোতে থাকারও ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া দরিয়ানগরের সমুদ্র সৈকতটি কক্সবাজারের মতো পর্যটকে ভরপুর থাকে না। যারা নির্জনে বেড়াতে পছন্দ করেন তাদের ভালো লাগবে সৈকতটি। মাঝেমধ্যে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিতে হয়। পাহাড়ের নিচে শাহেনশাহ গুহায় প্রবেশের সময় একটু সতর্ক থাকতে হয়। পিচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটা-চলায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও কম নয়। বর্ষার সময় সাপের উপদ্রবও নাকি থাকে। তবে গ্রীষ্ম ও শীতকালে গুহায় প্রবেশ নিরাপদ। এখানে সবসময় কিছু ছোট ছোট ছেলে মেয়ে থাকে। তারাই বলে এসব কথা। আমি অবশ্য কোনবার সাপ চোখে দেখিনি। এসব ছেলে মেয়কে গোটা পঞ্চাশ টাকা দিলে তারা গাইড হয়ে কাজও করে দেয়। টিকিট কাটার পর গেটেই দেখা মিলবে এদের।

কক্সবাজার শহর থেকে লোকাল বাসে দরিয়ানগরের ভাড়া ২০ টাকা। তারপর ২০ টাকার টিকিট কেটে কয়েক ঘণ্টার দরিয়ানগর পর্যটন কেন্দ্র ভ্রমণ। এছাড়া ব্যাটারি চালিত রিকশায় দরিয়ানগর যেতে ভাড়া লাগবে ৮০-১০০ টাকা।

দরিয়া-দর্শন : গুহার ওপরে প্রায় ১০০ ফুট উঁচু পাহাড় চূড়ায় ছন আর কাঠ দিয়ে তৈরি ‘চেরাংঘর’ বা ‘আড্ডাখানা’। এটিকে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও বলে পর্যটকরা। টাওয়ারে বসে উপভোগ করা যায় সাগর আর পাহাড়ের সৌন্দর্য। পাহাড় চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হবে, যেন বঙ্গোপসাগরের নীল জলের ওপরই দাঁড়িয়ে আছেন। নজরে পড়বে দূরের সাগরের নৌকাগুলো। গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে ফেরা ট্রলারের সারি। এই পাহাড়ের নিচে রাত যাপনের জন্য রয়েছে বাংলো বা রেস্টহাউস। বাংলোর সামনে সূর্যাস্ত দেখার জন্য রয়েছে ‘সানসেট ভিউ পার্ক’। পার্কের নিচে অর্থাৎ পাহাড়ের খাদে প্রাকৃতিক পরিবেশে তৈরি করা হয়েছে ১২টি কুঁড়ে। এখানে যে কেউ সপরিবারে রাত কাটাতে পারেন। রয়েছে একটি রেস্তোরাঁও, যাতে পাবেন নানা পদের মাছ।



Leave a Reply


error: Content is protected !!